১৯২৪ সাল। মুসলিম উম্মাহর মাথার ওপর থেকে দীর্ঘদিনের খিলাফতের ছায়াটুকু সরে গেছে। পশ্চিমা উপনিবেশ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর হতাশার ঘোর অন্ধকারে যখন পুরো মুসলিম বিশ্ব পথ হারাতে বসেছে, ঠিক তখন মিশরের ইসমাইলিয়া শহর থেকে জ্বলে ওঠে এক নতুন আশার প্রদীপ। সময়টা ১৯২৮ সাল। মাত্র ২২ বছর বয়সী এক তরুণ স্কুল শিক্ষক, হাসান আল-বান্না, মাত্র ছয়জন সঙ্গী নিয়ে শুরু করলেন এক নতুন পথচলা। জন্ম নিল ‘আল-ইখওয়ানুল মুসলিমুন’ বা মুসলিম ব্রাদারহুড।
এটি কেবল একটি সংগঠন নয়; এটি বিশ্বব্যাপী ঘুমন্ত তরুণদের চিন্তার জগতকে জাগিয়ে তোলার এক অমর মহাকাব্য।
ইখওয়ানের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো তারা ইসলামকে কেবল মসজিদের চার দেয়ালে কিংবা ব্যক্তিগত ইবাদতের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখেনি। যখন বিশ্ববাসীকে বোঝানো হচ্ছিল ইসলাম কেবল একটি ‘ধর্ম’, তখন হাসান আল-বান্না এবং পরবর্তীতে সাইয়েদ কুতুবের মতো চিন্তাবিদরা তাদের ক্ষুরধার লেখনী ও কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করলেন ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা।
”আল্লাহ আমাদের লক্ষ্য, রাসূল (সা.) আমাদের নেতা, কুরআন আমাদের সংবিধান, জিহাদ আমাদের পথ এবং আল্লাহর পথে মৃত্যুবরণ করা আমাদের সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা।”
এটিই ছিল ইখওয়ানের সেই বিখ্যাত স্লোগান, যা আজও লক্ষ তরুণের হৃদয়ে স্পন্দন তোলে।
একটি আন্দোলন কীভাবে মানুষের মনন ও সমাজকে বদলে দেয়, ইখওয়ান তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
ইখওয়ানের কাজের অনন্য বৈশিষ্ট্য:
তারবিয়াহ বা আত্মগঠন:
ইখওয়ান রাতারাতি ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেনি। এবং তারা জোরপূর্বক ইসলাম কে মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করেনি । বরং তারা জোর দেয় ‘ব্যক্তি গঠনের’ ওপর। ‘উসরাহ’ (ক্ষুদ্র পরিবার বা ইউনিট) ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি কর্মীকে জ্ঞান, আধ্যাত্মিকতা এবং যোগ্যতা সম্পন্নকরে গড়ে তোলার এক নীরব পাঠশালা তৈরি করেছে তারা।
বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ:
তরুণদের বইমুখী করা, নতুন জ্ঞান অন্বেষণ এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে ইসলামি চিন্তাধারার প্রসার ঘটানো তাদের অন্যতম কাজ। একটি চিন্তাশীল প্রজন্ম তৈরির জন্য তারা অসংখ্য স্কুল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পাঠাগার গড়ে তুলেছে।
সমাজমুখী কার্যক্রম:
হাসপাতাল, এতিমখানা, দাতব্য প্রতিষ্ঠান কোথায় নেই ইখওয়ান? সাধারণ মানুষের সুখে-দুঃখে একদম তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করে তারা প্রমাণ করেছে, ইসলামি আন্দোলন মানেই মানবতার সেবা।
বিশ্বব্যাপী প্রভাব ও ইসলামি আন্দোলনে এর গুরুত্ব:
আজকের বিশ্বে আমরা যতগুলো সুসংগঠিত ইসলামি আন্দোলন দেখি তা ফি*লি*স্তি*নের হা*মা*স হোক, তিউনিসিয়ার আন-নাহদা হোক, কিংবা ইন্দোনেশিয়ার পিকেএস হোক সবারই শেকড় কোনো না কোনোভাবে ইখওয়ানের চিন্তাধারার সাথে যুক্ত।
ইখওয়ানুল মুসলিমুন বিশ্বব্যাপী ইসলামি আন্দোলনগুলোকে শিখিয়েছে কীভাবে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে, চরম ধৈর্য ধারণ করে, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এবং সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে এগোতে হয়। পশ্চিমা বিশ্বের বুকে আধুনিক ইসলামি স্কলারদের একটি বড় অংশই ইখওয়ানের ভাবধারায় গভীরভাবে অনুপ্রাণিত।
ইখওয়ানের ইতিহাস কেবল সাফল্যের নয়, এটি চরম ত্যাগ আর কুরবানির ইতিহাস। হাসান আল-বান্না থেকে শুরু করে সাইয়েদ কুতুব, ড. মুরসি অসংখ্য নেতাকে হাসিমুখে শাহাদাত বরণ করতে হয়েছে। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ, ফাঁসির কাষ্ঠ কিংবা নির্বাসন কোনো কিছুই এই আন্দোলনের অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারেনি। বরং যতবার তাদের ওপর আঘাত এসেছে, ততবারই তারা নতুন শক্তিতে জেগে উঠেছে।
আল-ইখওয়ানুল মুসলিমুন আমাদের শেখায় সত্যের পথ কখনো কুসুমাস্তীর্ণ হয় না। একটি আদর্শ যখন মানুষের অন্তরে ও মগজে গেঁথে যায়, তখন কোনো বুলেট বা কারাগার তাকে বন্দি করতে পারে না। আজকের দিনে যারা সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন, নতুন জ্ঞান অর্জন করতে ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পথে হাঁটতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য ইখওয়ানের এই দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক ও ত্যাগের ইতিহাস, এক বিশাল অনুপ্রেরণার উৎস।

মতামত ও আলোচনা